ইউএসসিআইআরএফ-এর প্রতিবেদন
'বাংলাদেশে ভয়াবহ হামলা হয়েছে সংখ্যালঘুদের ওপর'
OCTOBER 2015
OCTOBER 2015

বাংলাদেশে গত বছর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হয়েছে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে। অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের মাধ্যমে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি লুট করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার কর্তৃক প্রকাশিত 'ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম' বা 'আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা' শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনের বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়।
প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব সহিংসতার পর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমর্থন করে বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু যে প্রতিবেদন বেরিয়ে এসেছে তাতে দেখা যায় সরকার আক্রান্ত এলাকায় যেসব পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীদের পাঠিয়েছে, তারা সেখানে সহিংসতা বন্ধ করতে পারেনি। এমনকি কিছু এলাকায় তারা নিজেরাই সহিংসতায় অংশ নিয়েছে। দেশের ২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ মানুষই সুন্নি মুসলিম। মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯.৫ ভাগ হিন্দু। বাকি শতকরা এক ভাগেরও কম রয়েছে খ্রিষ্টান, বৌদ্ধসহ অন্য ধর্মের মানুষ।
ইউনাইটেড স্টেট কমিশন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম (ইউএসসিআইআরএফ) ২৩৭ পৃষ্ঠার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে তাদের একজন কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফর করেন। রিপোর্টিংকালে ঢাকার রাজপথে আলাদাভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় দুজন ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারকে। তার একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিনি অভিজিৎ রায়। তাঁকে এ বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর স্ত্রীকে করা হয় মারাত্মক আহত।
এ ছাড়া, এ বছরের মার্চের শুরুতে এ ঘটনায় সন্দেহজনকভাবে একজনকে গ্রেপ্তার করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ৩০ মার্চ ওয়াশিকুর রহমানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। রিপোর্টিংকালে তিনজন নাস্তিককে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তাঁরা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের অপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত যুদ্ধাপরাধ আদালত নিয়ে ব্লগ প্রকাশের পর তাদেরকে গ্রেপ্তার করে অভিযোগ গঠন করা হয়, বলা হয় তাঁরা ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত দিয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে জামায়াতসংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি সরকারকে ৮৪ জনের একটি তালিকা দিয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার বিষয় তদন্ত করতে হবে। বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অর্ধেকেরও বেশি আসনে প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি তার ১৮ দলীয় রাজনৈতিক জোট নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ১৬টিতে।
প্রতিবেদনের বর্ণনা অনুযায়ী, বেশির ভাগ হামলা করেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গ্রুপ। ভূমি দখলের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় পুলিশ, জাতীয় সংসদের কিছু সদস্যসহ রাজনৈতিক নেতারা। সব সম্প্রদায় এতে আক্রান্ত হলেও হিন্দুরা বেশি আক্রান্ত হয়েছে। তাদেরকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য এমনটা করা হয় অনেক সময়। তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ অভিযোগ করে আসছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিসহ সরকারের কিছু সাফল্য থাকলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও অন্য রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে এমন ভাষা ব্যবহার করে। এতে ধর্মীয় ও সম্প্রদায়গত উত্তেজনা কমানোর পরিবর্তে তাকে উসকে দেয়।
বলা হয়, ২০১১ সালে ভেস্টেট প্রপার্টি রিটার্ন অ্যাক্ট করা হয় যাতে ১৯৭১ সালে বা তার পরে যেসব হিন্দুর জমি বা সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল- তা ফেরত দিতে হবে অথবা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তবে হিন্দু সম্প্রদায় ও কিছু এনজিও অভিযোগ করে যে, এই আইন এতটাই সংকীর্ণ যে, এর প্রয়োগ প্রক্রিয়া অসুবিধাজনক ও দীর্ঘমেয়াদি। সামান্য মাত্রায় এসব সম্প্রতি ফেরত দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনের পর সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হয়েছে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি লুট করা হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে। অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। শত শত হিন্দু তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছেন। খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।





No comments:
Post a Comment